
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের পেছনে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ফখরুল ইসলাম এবং আলতাব খানের বিরুদ্ধে নানা ধরণের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট জনশক্তি ব্যবসায়ী এবং প্রবাসীদের পক্ষ থেকে এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মূল যে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়েছে তা নিচে তুলে ধরা হলো:
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার: অপপ্রচারে মেতেছে বাদ পড়া সিন্ডিকেট গোষ্ঠী
দীর্ঘ দুই বছর পর পুনরায় উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। অতীতের মাত্র ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট ভেঙে এবার রেকর্ড সংখ্যক ৩৩৮টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণের পথ সুগম করা হয়েছে। তবে সরকারের এই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বাদ পড়া সিন্ডিকেটের অন্যতম হোতারা নানা অপপ্রচারে মেতে উঠেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
১. সিন্ডিকেট বিলোপ ও ৩৩৮ এজেন্সির অনুমোদন
তালিকা সংশোধন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পাঠানো ৪২৩টি এজেন্সির প্রাথমিক তালিকা পুনর্বিবেচনা করা হয়।
বিগত আমলের সিন্ডিকেট বাদ: বিগত সরকারের আমলঘেঁষা ৮৫টি সংস্থাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
চূড়ান্ত অনুমোদন: যাচাই-বাছাই শেষে সর্বোচ্চ ৩৩৮টি এজেন্সিকে কর্মী প্রেরণের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
২. অপপ্রচারের নেপথ্যে চিহ্নিত দুই হোতা ব্যবসায়িক সুযোগ হারিয়ে ক্ষুব্ধ একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ এবং অসত্য তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন:
মোঃ ফখরুল ইসলাম: স্বত্বাধিকারী, হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (আরএল-০৪৫২)।
মোঃ আলতাব খান: স্বত্বাধিকারী, আফিয়া ওভারসীস (আরএল-১০১০)।
৩. ফখরুল ইসলামের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র অনুসন্ধানে ফখরুল ইসলামের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে:
অতীতে কর্মী প্রেরণ: বিগত সরকারের আমলেও তিনি ‘ত্রিবেণী ওভারসীস’ ও ‘সেলিব্রেটি ইন্টারন্যাশনাল’-এর মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠান।
মেডিকেল বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা: নিজের প্রতিষ্ঠান ‘ওয়েলকাম মেডিকেল ডায়াগনস্টিক সেন্টার’-এর মাধ্যমে প্রায় ৭০–৮০ হাজার কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গ্রেফতার ও কালো তালিকাভুক্ত: মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী পাঠাতে নথিপত্রের অপব্যবহার করায় তার লাইসেন্স ১ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মানব পাচার ও ৩.০২ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তিনি গ্রেফতার হন।
অর্থায়ন ও যোগসাজশ: ইউনিক গ্রুপের নূর আলীর অর্থায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি শ্রমবাজার ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি বিতর্কিত অভিবাসন এক্টিভিস্ট অ্যান্ডি হলের সঙ্গেও তার ও আলতাব খানের ঘনিষ্ঠ যোগসাজশ রয়েছে।
নির্বাচনী কৌশল: আসন্ন বায়রা (BAIRA) নির্বাচনে বঞ্চিত এজেন্সিগুলোর ভোট পেতে নিজেকে ‘সিন্ডিকেট বিরোধী’ হিসেবে জাহির করলেও মূলত তিনি নিজস্ব স্বার্থ হাসিলে লিপ্ত।
৪. আইনি ব্যবস্থা ও দুদক তদন্তের জোরালো দাবি ফখরুল ইসলাম ও আলতাব খানের এসব বিতর্কিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে রিক্রুটিং এজেন্সির সচেতন মহল কঠোর অবস্থানের দাবি জানিয়েছেন:
আইনি পদক্ষেপ: তাদের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
দুদক তদন্ত: বিগত সরকারের আমলে তাদের অর্জিত অবৈধ সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর জরুরি হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
৫. ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো: রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক কিছু সদস্য এবং সাধারণ প্রবাসীদের অভিযোগ, ফখরুল ইসলাম বিভিন্ন টকশো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং গণমাধ্যমে শ্রমবাজার সংক্রান্ত নানা ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। এর ফলে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তাদের মধ্যে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের অনীহা ও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়।
৬. অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ: অতীতে সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়া এবং হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সাধারণ ব্যবসায়ীরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। তারা চান সমস্ত বৈধ লাইসেন্সধারী সংস্থাকে সমান সুযোগ দেওয়া হোক।
৭. অনুমোদনহীন ব্যবসায়িক তৎপরতা ও সিন্ডিকেট: অভিযোগ রয়েছে যে, আলতাব খান মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির কোনো বৈধ বরাদ্দ (অ্যালোকেশন), সরকারি অনুমোদন বা দূতাবাসের সত্যায়ন কপি ছাড়াই অনৈতিকভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট ও একচেটিয়া মনোপলি সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এবং বাজারকে অস্থিতিশীল করার নেতিবাচক প্রচারণার অভিযোগও রয়েছে।
৮. বাজার বন্ধের নেপথ্য ষড়যন্ত্র: ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশের দাবি, এই ব্যক্তিদের নানামুখী অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আইনি জটিলতা তৈরির অপচেষ্টা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের প্রভাব ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন