মেট্রো নিউজ অনলাইন ডেস্ক
২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

সারের পর ডিজেলেও বাড়তি খরচ, দুশ্চিন্তায় কৃষক

সারের বাড়তি খরচের চাপ কাটতে না কাটতেই ডিজেলের ব্যয় নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। সেচনির্ভর চাষাবাদে ডিজেল অপরিহার্য হওয়ায় এর দামের প্রভাব সরাসরি পড়ছে উৎপাদন খরচে। ফলে বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষক।

চলতি আমন ধানের মৌসুমে দেশজুড়ে বিভিন্ন জেলায় সারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সার না পাওয়ায় কৃষকরা বহু এলাকায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে চড়া দামে তা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। উপরন্তু, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকদের মজুরির দাম বাড়ায় আমন ধান উৎপাদনের খরচও বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ডিজেলের দামও আকাশছোঁয়া হয়েছে।

সরকারের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। ফলে, এই মৌসুমে শুধু আমন ধান উৎপাদনের খরচই বাড়বে না, বরং আসন্ন বোরো ধানের মৌসুম নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

দুই মাস পর, নভেম্বরের শেষে, বোরো ধান রোপণের জন্য জমি তৈরির কাজ শুরু হবে। এরপর জমি তৈরি থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত প্রায় পুরো মৌসুম জুড়েই সেচের প্রয়োজন হবে। দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো জাত থেকে। ফলে, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি বোরো ধানের উৎপাদন খরচের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, উৎপাদন খরচ বাড়লে এবং কৃষকরা তাদের ধানের ন্যায্য মূল্য না পেলে, এটি তাদের বোরো ধান চাষে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এতে একদিকে যেমন কৃষকদের আয় কমে যাবে, অন্যদিকে ধানের সরবরাহ ও বাজারদরের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।

কৃষকদের জন্য এই অতিরিক্ত খরচের পরিমাণ প্রায় ২.৮৮ বিলিয়ন টাকা। সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। এর আগে, চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা হয়েছিল। অর্থাৎ, মাত্র পাঁচ মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৩৫ টাকা বেড়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪.৩৫ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০,৪৪,০০০ টন কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। কৃষিক্ষেত্রে ডিজেলের ব্যবহার শুধু সেচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জমি তৈরি, চারা রোপণ, ফসল কাটা, মাড়াই, পরিষ্কার এবং কৃষি পণ্য পরিবহনেও এটি ব্যবহৃত হয়। ফলে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব উৎপাদনের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই অনুভূত হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আগের দামে কৃষকরা ডিজেলের জন্য বছরে প্রায় ১২.০৬ বিলিয়ন টাকা ব্যয় করতেন। প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়লে সেই খরচ বেড়ে প্রায় ১৪.০৯৪ বিলিয়ন টাকা হবে। অর্থাৎ, কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ২.০৮৮ বিলিয়ন টাকা।

বর্তমানে জমিতে আমন ধান রয়েছে। অনেক এলাকায় ফসল কাটার মৌসুম আসন্ন। কৃষকরা জানিয়েছেন যে ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের খরচ বাড়বে।

নওগাঁ জেলার হোগলবাড়ি গ্রামের কৃষক মাহবুব তালুকদার মন্তব্য করেন যে, এ বছর আমন ধান চাষের মোট খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এই খরচগুলোর মধ্যে সার ও সেচের দাম বেড়েছে। এখন ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে ধান মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। তিনি বলেন, “আমন ধানের পেছনেই যদি এত খরচ হয়, তাহলে বোরো ধানের কী হবে তা ভেবেই ভয় লাগছে। বোরো ধানে অনেক সেচের প্রয়োজন হয়। তাই এবার কম সেচের প্রয়োজন হয় এমন এক ধরনের ধান চাষ করার কথা ভাবছি।”

নোয়াখালীর সুবর্ণচর মহকুমার কৃষক আজি উল্লাহ মন্তব্য করেন যে, আমনের চেয়ে বোরো ধানে অনেক বেশি সেচের প্রয়োজন হয়। ডিজেলের দাম বাড়ার কারণে সেচ ও মাড়াইয়ের খরচও বাড়বে। এতে অনেকেই বোরো চাষে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

জয়পুরহাটের কালাই মহকুমার কৃষক সিদ্দিক মিয়া বলেন যে, এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে চাষাবাদ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। কৃষকদের খরচ বাড়ছে, কিন্তু ধানের দাম সেই হারে বাড়ছে না। নিজের ফসল বিক্রি করে চাষাবাদ থেকে জীবিকা নির্বাহ করা সম্ভব নয়।

বোরো ধান নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ
বাংলাদেশে বোরো ধান চাল উৎপাদনের একটি প্রধান উৎস। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ এই ফসল থেকে আসে। এর চাষাবাদ সম্পূর্ণরূপে সেচের উপর নির্ভরশীল।

কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০,৩৯,৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং ১,৮৪,৩৮৪টি নিম্নচাপের পাম্প রয়েছে। এই সেচ যন্ত্রগুলোর বেশিরভাগই ডিজেল চালিত। এছাড়াও, প্রায় ১৬ লক্ষ ছোট ডিজেল চালিত সেচ যন্ত্র রয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। দেশে প্রায় ১০,০০০ কম্বাইন হারভেস্টার, কয়েক লক্ষ ঘাস কাটার যন্ত্র, সেইসাথে মাড়াই, ঝাড়ু দেওয়া এবং অন্যান্য ধরনের যন্ত্রপাতি রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে প্রায় ১৯ লক্ষ কৃষি যন্ত্রপাতি রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ ডিজেল চালিত।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত বোরন মৌসুমে ডিজেলের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এর মানে হলো, আগামী ডিসেম্বরে যখন বোরন মৌসুমের প্রস্তুতি শুরু হবে, তখন কৃষকদের চড়া দামে ডিজেল কিনতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য:

কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, বাংলাদেশের কৃষি ডিজেল সেচের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে দাম বাড়লেও কৃষির জন্য ডিজেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ মেটাতে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, উৎপাদন খরচ বাড়লে অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে অনেক কৃষক ফসল ফলাতে পারবেন না। ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। খাদ্য আমদানিও বাড়তে পারে। তেলের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোর জন্য যে অর্থ সংগ্রহ করা হবে, তা পরবর্তীতে বিদেশ থেকে চড়া দামে খাদ্য আমদানির জন্য ব্যবহার করতে হতে পারে। খাদ্য উৎপাদন বজায় রাখতে এবং কৃষকদের সহায়তা করতে, এখনই ভর্তুকির মাধ্যমে তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আমন ধানের মৌসুমে বৃষ্টির অভাবে অনেক কৃষককে সেচের জন্য অতিরিক্ত বিনিয়োগ করতে হয়েছে। তাছাড়া, বোরো মৌসুমে প্রায় ৭৫% আবাদি জমিতে ডিজেল চালিত সেচ পাম্প ব্যবহার করা হয়। ফলে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব হবে ব্যাপক। বর্তমানে যেখানে বছরে ১০ থেকে ১.৫ মিলিয়ন টন চাল আমদানি করা হয়, সেখানে উৎপাদন কমে গেলে এই পরিমাণ বেড়ে ২০ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন হতে পারে। এতে সরকারি ব্যয় বাড়বে এবং জনগণের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন যে, তেলের দাম বাড়লে তা স্বাভাবিকভাবেই সবকিছুকে প্রভাবিত করবে। এতে কৃষকদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে মাঠে থাকা আমন ধান কাটা, মাড়াই এবং পরিবহনের খরচও বাড়বে।

তিনি আরও বলেন যে, কৃষকদের এই অতিরিক্ত খরচ মেটানোর জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। অন্যথায়, ভবিষ্যতের উৎপাদন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষকরা যদি ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে তারা পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। এটি খাদ্য নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মণ্ডল বলেছেন, স্বাভাবিক কৃষি উৎপাদন বজায় রাখতে প্রয়োজনে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থেকে তহবিল বাঁচিয়ে কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো যেতে পারে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, সরকার কৃষকদের সহায়তা করে এবং তাদের বিনামূল্যে বীজ ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ সরবরাহ করে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি কৃষিক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব ফেলবে। তবে, এই প্রভাব মূল্যায়ন করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বাংলাদেশ-জাপান বৈঠকে জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতায় জোর

১

দুই মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শাহবাগে গণবিক্ষোভ করবে এনসিপি

২

ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’-এর শঙ্কা, আঘাত হানতে পারে যেসব এলাকায়

৩

নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের ভোট ভিক্ষা চেয়েছে বিএনপি: জামায়াতের আমির

৪

চার দিনের সফরে আজ রাতে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

৫

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ার আশা টোকিওর

৬

ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমেরও ভূমিকা ছিল: জামায়াত আমীর

৭

২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে জাপানে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ

৮

আজ দুপুরে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেব: ইশরাক

৯

ডেঙ্গু প্রতিরোধই মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র: প্রধানমন্ত্রী

১০

কক্সবাজারের ইনানীতে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৬

১১

অবশেষে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের ঘোষণা মালয়েশিয়ার

১২

পরিবেশ সুরক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

১৩

পাকিস্তানে স্কুলের ছাদ ধসে ২০ শিক্ষার্থীসহ নিহত ২১

১৪

ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা নির্ধারণে নতুন অধ্যাদেশ জারি

১৫

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পূজার ছুটি শুরু, শনিবার খোলা সরকারি অফিস

১৬

দেশ গঠনে আপনাদের মতো মানুষের প্রয়োজন: তিন অনুপ্রেরণাদায়ীকে প্রধানমন্ত্রী

১৭

সৌদির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর ভবনে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

১৮

ডেঙ্গু প্রতিরোধে পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

১৯

ঢাকা–রিয়াদ রুটে ৬১ ফ্লাইট বাতিল, দুর্ভোগে ৯ হাজারের বেশি যাত্রী

২০