
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এবার বঙ্গভবনের পথে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর জীবনের নতুন এক অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছেন তিনি। শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা ও রাজনীতির নানা বাঁক পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তার সামনে।
বিএনপির রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে তার নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর প্রায় ছয় দশকের এই পথচলা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদের মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। আজ (বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট) দুপুরে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়ন পত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টা। মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিন ১৬ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট। একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদ ভবনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির পদ থেকে মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করেছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে তাদের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদকে মনোনয়ন দিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। জাতীয় পরিষদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দলটির প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬শে জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন রাজনীতিবিদ এবং প্রাক্তন সংসদ সদস্য। পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হন।
ঢাকা কলেজে পড়াশোনার পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করেন।
তবে, পড়াশোনা শেষ করার পর মির্জা ফখরুল সরাসরি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেননি। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতি পড়াতেন। পরে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কয়েক বছর চাকরি করার পর ১৯৮৬ সালে তিনি পদত্যাগ করে পুনরায় সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন।
রাজনীতিতে ফিরে এসে মির্জা ফখরুল প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯২ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নিযুক্ত হন।
জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর বড় উত্থান ঘটে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় নিযুক্ত হন। তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতেও তাঁর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুলকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মির্জা ফখরুল ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। ২০১১ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিযুক্ত হন। এরপর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের মহাসচিব হন।
এরপর প্রায় এক দশক ধরে তিনি বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসনের সময় তিনি দলের কর্মসূচি, আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই সময়ে তিনি মামলা, গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিকূলতারও সম্মুখীন হন।
ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, পৌরসভা চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে দলের দীর্ঘদিনের মহাসচিব—মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন বহু বাঁক নিয়েছে। প্রতিটি পর্যায়ে তাঁর দায়িত্ব ও পরিধি বদলেছে।
এখন সেই পথে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ার সম্ভাবনা যুক্ত হতে চলেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির দায়িত্ব থেকে তাঁর বিদায় শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনেই পরিবর্তন আনবে না, দলের নেতৃত্ব কাঠামোতেও একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। একই সাথে সরকারের মন্ত্রিসভাতেও পরিবর্তন আসবে।
ঠাকুরগাঁওয়ের একজন শিক্ষক থেকে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বে, এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি ভবনের সম্ভাব্য বাসিন্দা, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা এখন এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
মন্তব্য করুন