
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির রাস্তায় বহুল আলোচিত ‘যন্তর মন্তর ২.০’ বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বড় ধরনের ধাক্কা খেল। শনিবার সকালে মুম্বাই থেকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পরপরই সিজেপির তিন শীর্ষ নেতা—অভিজিৎ ডিপকে, সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা—কে বিমানের ভেতর থেকেই আটক করে দিল্লি পুলিশ।
একই সময়ে, প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ সাবস্ক্রাইবার-বিশিষ্ট জনপ্রিয় ভারতীয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে হরিয়ানার গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-তে অবস্থিত তাঁর বাসভবন থেকে আটক করা হয়। সিজেপির বিশাল সমাবেশে যোগ দিতে এবং তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে রাঠি গুরুগ্রাম থেকে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন; বিপুল জনসমাগম ঘটানোর সক্ষমতা থাকায় তাঁকে এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল।
এ ছাড়াও, সারা রাত ধরে চলা বিশেষ অভিযানে দিল্লি ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে ১,২০০-এরও বেশি বিক্ষোভকারী ও সমর্থককে পুলিশ আটক করেছে; এদের মধ্যে সিজেপির আইনি দলের প্রধান রত্ন সিনহাও রয়েছেন।
ভোটার তালিকায় ব্যাপক জালিয়াতি এবং ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলে সিজেপি ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলো সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার এই বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল। তবে অনুমতি না থাকা এবং নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে দিল্লি পুলিশ রাতারাতি ব্যাপক দমন-পীড়ন শুরু করে। আটক নেতাদের ঠিক কোথায় রাখা হয়েছে সে বিষয়ে পুলিশ মুখ না খুললেও, বিমানে ওঠার আগে সিজেপি প্রধান একটি বার্তা দিয়ে গিয়েছিলেন: কোনো অবস্থাতেই যেন আন্দোলন থেমে না যায়—এমনকি তিনি বা শীর্ষ নেতারা আটক হলেও।
এদিকে, শীর্ষ নেতাদের আটকের তীব্র নিন্দা জানিয়ে সিজেপি একটি জরুরি বিবৃতি দিয়েছে। এতে এই পদক্ষেপকে চলাফেরার সাংবিধানিক স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। দলটির দাবি, নেতাদের বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানো ঠেকাতে প্রশাসন পূর্বপরিকল্পিতভাবে এই বেআইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা আটক সকল নেতার অবিলম্বে ও নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে। বিক্ষোভ দমনের লক্ষ্যে পুরো দিল্লি জুড়ে এক অভূতপূর্ব নিরাপত্তা বলয় বা লকডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বৃহৎ নিরাপত্তা অভিযান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে:
২৭ হাজার নিরাপত্তা কর্মীর মোতায়েন: কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পুলিশ বাহিনী এবং আধা-সামরিক বাহিনীর প্রায় ২৭ হাজার সশস্ত্র সদস্য দিল্লির রাস্তায় টহল দিচ্ছেন।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ: জনপথ-কর্তব্য পথ সংযোগস্থলের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে টানা ২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট ও ডেটা পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
মেট্রো ও দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল স্থগিত: রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট এবং কাশ্মীর গেট-সহ ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হযরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে আসা বা সেখান থেকে ছেড়ে যাওয়া ২৫০টিরও বেশি দূরপাল্লার ও লোকাল ট্রেন বাতিল করা হয়েছে।
প্রশাসনের এই কঠোর দমন-পীড়ন এবং শীর্ষ নেতাদের আটকের ফলে ভারতের রাজধানীতে তীব্র উত্তেজনা ও যুদ্ধক্ষেত্রের মতো এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি / ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
মন্তব্য করুন