
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে ‘চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ (সিইআইজেড)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাতে এক নতুন ও ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের (জি-টু-জি) যৌথ উদ্যোগে এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর নীতিমালার আলোকে গৃহীত এই প্রকল্পটি দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, বহুমুখী শিল্পায়ন এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।
আজ চট্টগ্রামের আনোয়ারায় সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার সময় মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানটিতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী সভাপতির ভাষণ দেন।
প্রধান অতিথি হিসেবে দেওয়া ভাষণে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সহজতর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এর অংশ হিসেবে, অবকাঠামো ও শিল্প স্থাপনায় সরকারি নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিশাল বিনিয়োগ অর্জিত হতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের দ্রুত ও সহজ সেবা নিশ্চিত করতে সরকার ১০০% কার্যকর ‘একক জানালা সেবা’ চালুর পাশাপাশি পুঁজিবাজার ও পুঁজি খাতে কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, শিল্পায়নের পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য আবাসন, আধুনিক জীবনযাত্রার মান এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি দেশীয় শিল্পের উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালীকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলে একটি আধুনিক ‘দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র’ স্থাপনের জন্য চীনা অংশীদারদের প্রতি আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আজ আনোয়ারার এই উর্বর মাটিতে সিইআইজেড-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে আমরা শুধু মাটিই খুঁড়ছি না, বরং বাংলাদেশের শিল্প রূপান্তরে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছি।” তিনি উল্লেখ করেন যে, দুই দেশের পারস্পরিক আস্থা, গভীর বন্ধুত্বের দৃঢ় ভিত্তি এবং যৌথ সনদের আলোকে গৃহীত এই জি-টু-জি প্রকল্পের মাধ্যমে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
প্রকল্পটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন যে, প্রায় ৭৭৬ একর (৩১৪.৩৯ হেক্টর) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বৃহৎ প্রকল্পটি শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চলেই ৩৬,০০০-এরও বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, যা স্থানীয় যুবকদের উন্নয়নে এক অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলবে। তৈরি পোশাক ও বস্ত্র শিল্পের পাশাপাশি এই অঞ্চলে বায়ো-ফার্মাসিউটিক্যালস, খাদ্য ও পানীয় প্রক্রিয়াকরণ এবং চামড়াজাত পণ্যের মতো উচ্চমূল্যের শিল্প স্থাপন করা হবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে আরও বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী করবে।
ভৌগোলিক ও লজিস্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিইআইজেড একটি অত্যন্ত সুবিধাজনক স্থানে অবস্থিত উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এটি কর্ণফুলী টানেল থেকে মাত্র ৭০০ মিটার, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৬ কিলোমিটার এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এটি সরাসরি এন-১ জাতীয় মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত থাকায় এর পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ ও দ্রুত হবে। তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে, যা টেকসই শিল্পায়নের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
বিনিয়োগকারীদের সার্বিক নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সিইআইজেড-এর সার্বিক নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন করিডোর এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে আইন প্রয়োগকারী বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত থাকবে। একই সাথে, তিনি বেজা-র ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস)’-এর মাধ্যমে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো পরিষেবা ও দ্রুত অনুমোদন নিশ্চিত করে একটি সহজ ও সমৃদ্ধ বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরিতে তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বক্তৃতার শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই বৃহৎ প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য বেজা, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশন (সিআরবিসি), ঢাকায় অবস্থিত চীনা দূতাবাস এবং বিশেষ করে আনোয়ার ও চট্টগ্রামের জনগণকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই শিল্পাঞ্চলটি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্থায়ী অর্থনৈতিক ও বন্ধুত্বের একটি টেকসই সেতু হিসেবে কাজ করবে।
অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ার-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম এবং ভাইস চেয়ারম্যান।
মন্তব্য করুন