মেট্রো নিউজ অনলাইন ডেস্ক
২৪ জুলাই ২০২৬, ৯:৩৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিদায়ের গল্প

২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের সাংবিধানিক সর্বোচ্চ পদে যাত্রা শুরু করেছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ইস্যু, বিতর্ক এবং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। অবশেষে পদত্যাগের মধ্য দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে তাঁর রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অধ্যায়।

২০২৩ সালের ২৪ জুলাই মো. শাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর মেয়াদকালে তিনি আওয়ামী লীগ সরকার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সর্বশেষ বিএনপি সরকারের প্রধানকে শপথবাক্য পাঠ করান। যদিও দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক থামেনি।

তবে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের সময় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু এর পরপরই বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া তাঁর একাধিক সাক্ষাৎকার নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। এই বিতর্ক সত্ত্বেও, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক নিযুক্ত রাষ্ট্রপতি পদে তিনি থেকে যান।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র ও জনগণের গণঅভ্যুত্থানের কারণে শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এ সময় দেশে এক চরম সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। তবে এই সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন রাষ্ট্রপতি।

সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করতে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন পরদিন সংসদ ভেঙে দেন। সংবিধানের ১০৬ ধারা অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস শপথ গ্রহণ করেন। একই দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টারাও রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের সামনে শপথ নেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগ এবং দিনভর বিভিন্ন উত্তেজনা ও ঘটনার পর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার আগে তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।

কিন্তু অভ্যুত্থানের আড়াই মাস পরই সমস্যা দেখা দেয়। রাষ্ট্রপতি একটি জাতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দেন। তিনি দাবি করেন যে শেখ হাসিনার পদত্যাগের ‘কোনো দস্তাবেজি প্রমাণ’ তার কাছে নেই। এতে অভ্যুত্থানকারীরা ক্ষুব্ধ হয়। তার পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং বঙ্গভবন ঘেরাও করা হয়। রাষ্ট্রপতির বাসভবন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

তবে, এমন বিক্ষোভের মুখেও অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেয়নি। যদিও তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে ‘মিথ্যা’ বলে আখ্যা দেন।

সেই সময় আলোচনা চলছিল যে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করলে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে। এমন আশঙ্কা থেকেই বিএনপি মো. শাহাবুদ্দিনকে অপসারণের বিরোধিতা করেছিল।

এরপর নানা আলোচনা ও সমালোচনা সত্ত্বেও রাষ্ট্রপতি মো. শাহাবুদ্দিন পদে বহাল ছিলেন। ২০২৬ সালের শুরুতে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হওয়ার পরেও নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করেন। তবে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে বিতর্ক তখনও থামেনি।

সরকার গঠনের পর সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। বিরোধী দলের সদস্যরা রাষ্ট্রপতিকে ‘জুলাইয়ের বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দিয়ে অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন। কিন্তু সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষার জন্য সরকারি দল তখনও রাষ্ট্রপতিকে সমর্থন করে।

এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে ধীরে ধীরে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেখা যায়। যা অন্তর্বর্তী সরকারের আগের দেড় বছরে দেখা যায়নি। বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সে সময় গৃহবন্দী থাকার অভিযোগও করেন। অনেকেই ভেবেছিলেন যে তিনি হয়তো পূর্ণ মেয়াদের জন্য রাষ্ট্রপতির পদে থেকে যাবেন।

কিন্তু এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি চিকিৎসার জন্য ৯ই মে লন্ডনে যান। তিনি ১৮ই মে ফিরে আসেন। তারপর থেকেই রাষ্ট্রপতি ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। হঠাৎ বিভিন্ন গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

এরপর গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের কাছে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন।

মো. সাহাবুদ্দিনের পথচলা

মো. সাহাবুদ্দিন ১৯৪৯ সালে পাবনা শহরের জুবিলি টাঙ্কপাড়া (শিবরামপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মা হলেন শরফুদ্দিন আনসারী ও খায়রুন্নেসা। তিনি ১৯৬৬ সালে এসএসসি পাস করেন। এবং ১৯৬৮ সালে পাবনার এডওয়ার্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিনি ১৯৭১ সালে বিএসসি পাশ করেন (পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে)।

পরবর্তীতে, তিনি ১৯৭৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরের বছর, ১৯৭৫ সালে, তিনি পাবনার শহীদ অ্যাডভোকেট আমিনুদ্দিন আইন কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

ছাত্রজীবনে পাবনা জেলা ছাত্র লীগের সক্রিয় কর্মী ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. সাহাবুদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র পরিষদের জেলা সভাপতি হিসেবে তিনি পাবনায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট সামরিক আইনের ৭ ধারায় তিনি গ্রেপ্তার হন। সে সময় মো. সাহাবুদ্দিন প্রায় তিন বছর কারাবন্দী ছিলেন।

কারাবাসের পর মো. সাহাবুদ্দিন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাবনা জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হিসেবে আইন পেশায়ও যোগ দেন। তিনি ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এই পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে, ১৯৮২ সালে তিনি বিসিএস (জুডিশিয়ারি) ক্যাডারে যোগদান করেন। বিচার বিভাগে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের পর তিনি ২৫ বছর শেষে ২০০৬ সালে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ ২৯ অক্টোবর

আটক ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার না দেখালে ‘গুম’ হিসেবে গণ্য হবে: চিফ প্রসিকিউটর

একরামুল হত্যা: ট্রাইব্যুনালে হাজির ৩ সেনা কর্মকর্তা

সংঘাত নয়, সমঝোতায় দেশ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন দুয়ার, কাটেনি পুরোনো শঙ্কা

বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি তারেক রহমান

পঁচা শামুকে পা কাটবে, টেরও পাবেন না: জামায়াত আমির

জাতিসংঘের নতুন বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশের কী পরিবর্তন হচ্ছে?

২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠক

১০

নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে চালু হলো পিংক বাস: উদ্বোধন সড়কমন্ত্রীর

১১

উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকারের ওপর আস্থা রাখুন: প্রধানমন্ত্রী

১২

অজিদের ডেরায় টাইগারদের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়

১৩

শিক্ষকতা থেকে বঙ্গভবন—মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ পথচলা

১৪

মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করে মনোনয়নপত্র জমা বিএনপির

১৫

এসএসসি-সমমানের ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ

১৬

রাষ্ট্রপতি পদে ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করেছে বিএনপি

১৭

একদিকে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলবেন আবার বন্ধুত্ব চাইবেন, দুটো বিপরীতমুখী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮

ঢাকার চারপাশের নৌপথ সচল করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

১৯

“আগস্টেই যোগদানের দাবিতে শাহবাগে প্রাথমিকের সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবস্থান”

২০