মেট্রো নিউজ অনলাইন ডেস্ক
৫ জুলাই ২০২৬, ১:৩৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

দরিদ্রদের সহায়তার জন্য ৮ কোটি, বিতরণে খরচ ৫৩ কোটি!

৮ কোটি, বিতরণে খরচ ৫৩ কোটি!

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঘরবাড়ি হারানো ৩০০ অসহায় মানুষের পুনর্বাসন ও জীবিকার উন্নয়নে প্রায় ৮ কোটি টাকার অনুদান দেওয়ার লক্ষ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন এবং স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আওতায় ৩০০ জন অসহায় মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য অনুদান হিসেবে প্রায় ৮ কোটি টাকা দেওয়া হবে। তবে, এই অনুদানের টাকা বিতরণে পরামর্শক ও প্রশাসনিক বিলাসিতায় ৫৩ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে গৃহহীন ও দরিদ্র মানুষকে সাহায্যের নামে প্রস্তাবিত প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থ আমলা ও পরামর্শকদের পকেটে দক্ষতার সাথে পুরে দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ব্যয় ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জিআইজেড) দ্বারা অর্থায়িত এই প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ১ বছর ৯ মাস। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত প্রকল্প নিয়ে রবিবার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের মতো শহরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা। এর মাধ্যমে ৩০০ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা এবং ১৫০০ জনের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটের চিত্র থেকে দেখা যায়, এই লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে বরাদ্দের সিংহভাগই প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে খরচ হবে।

দরিদ্রদের জন্য মাত্র ১৩.২৩ শতাংশ, বাকিটা অন্যদের পকেটে: প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকার মোট বাজেটের এই প্রকল্পের পরোক্ষ ব্যয় মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। প্রকল্পের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, গরীবদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের নামে বরাদ্দকৃত এই বিপুল পরিমাণ অর্থের মধ্যে মাত্র ৮ কোটি ১০ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা অনুদান হিসেবে প্রকৃত অভাবী মানুষের হাতে পৌঁছাবে, যা মোট বাজেটের মাত্র ১৩.২৩ শতাংশ। আর এই অনুদানের অর্থ বিতরণের বিপরীতে বাকি ৫৩ কোটি ১৮ লক্ষ ৭৪ হাজার টাকা কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা খরচ, অফিসের ভাড়া এবং বিলাসিতায় ব্যয় করা হবে।

সহায়তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আমলা ও পরামর্শকদের তুষ্ট করা: প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, লক্ষ্য হলো তিনটি জেলায় মাত্র ৩০০ জন গরীব মানুষের (২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী) জন্য ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা; কিন্তু এই ৩০০ জনের মধ্যে অনুদান বিতরণে ‘পরামর্শ’ দেওয়ার জন্য ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ করা হচ্ছে। তাদের জন্য আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯.৬২ কোটি ৬৩ হাজার টাকা।

অর্থাৎ, যেখানে সরাসরি গৃহহীনদের জন্য মাত্র ৮ কোটি টাকা দেওয়া হবে, সেখানে দেশি ও বিদেশি পরামর্শকদের পেছনে ব্যয় করা হবে ২৯.৬২ কোটি ৬৩ হাজার টাকা; যা মূল খরচের ৪৮.৩৩ শতাংশ।

নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিদেশ ভ্রমণের চাহিদা: সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর নির্দেশনা এবং বিদেশ ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, এই প্রকল্পে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ‘ইচ্ছা’ মেটাতে কোনো দ্বিধা করা হয়নি। কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণের নামে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, অভ্যন্তরীণ ভ্রমণের জন্য রাখা হয়েছে ১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

জিআইজেড-এর সহায়তায় গরীবদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে গৃহীত এই প্রকল্পে ব্যবস্থাপনা চার্জ হিসেবে রাখা হয়েছে ১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এছাড়া, অফিস ভবনের ভাড়ার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র অনুযায়ী, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাকি টাকা প্রশিক্ষণ কর্মশালা, প্রশাসনিক ও পরিষেবা বিল, বিভিন্ন অফিস সরঞ্জাম ক্রয়, পরিবহন ও জ্বালানি এবং অন্যান্য পরিষেবা ও সরবরাহের জন্য ব্যয় করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, প্রকল্প প্রস্তাবে অস্পষ্টতা রয়েছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া ও নিয়ম লঙ্ঘন: প্রকল্পের আওতায় সহায়তাপ্রাপ্ত বাস্তুচ্যুত ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়নি। এছাড়াও, অভিযোগ উঠেছে যে প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনা ‘পিপিএ-২০০৬’ এবং ‘পিপিআর-২০০৮’-এর নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। এমনকি প্রকল্পের মেয়াদের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে অতিবাহিত হয়ে যাওয়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র অনুযায়ী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ব্যয় কাঠামো নিয়ে পিইসি সভায় বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে চলেছে। প্রকল্পের অধীনে পরামর্শক, বিদেশ ভ্রমণ এবং অফিসের ভাড়াসহ বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। এছাড়াও, সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) যথাযথভাবে অনুসরণ না করার বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

“বঙ্গভবনে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি”

“আয়কর রিটার্নে ১০টি সাধারণ ভুল—জানুন কী কী”

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ইস্যুতে ভারপ্রাপ্ত স্পিকার-সিইসি বৈঠক চলছে

বাংলাদেশ গড়ার কাজ নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে নিতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

তিন শর্ত মেনে পুনরায় লাইসেন্স পেল আদ্-দ্বীন হাসপাতাল

বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংবিধান মেনেই যথাসময়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে: মির্জা ফখরুল

শাপলা চত্বর হত্যা মামলা: শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল

সেনাসদর নির্বাচনি পর্ষদ-২০২৬’ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

হজের প্রাথমিক নিবন্ধন শুরু ২৭ জুলাই ২০২৬

১০

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, আলোচনায় যাঁরা

১১

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন: দায়িত্ব গ্রহণ থেকে বিদায়ের গল্প

১২

৫০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা শুরু কবে, জানাল পিএসসি

১৩

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের ইঙ্গিত, উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা

১৪

খালেদা জিয়ার কারাবন্দির ঘটনায় আলোচিত ফরিদা ইয়াসমিন এখনও গুরুত্বপূর্ণ পদে

১৫

আইন ভঙ্গের দায়ে ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল

১৬

সেনা আইনেই হবে মোজাফফর হোসেনের বিচার, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৭

শতবর্ষের বিশ্বকাপ ২০৩০: কবে, কোথায় হবে?

১৮

রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সতর্কসংকেত

১৯

২০২৬ বিশ্বকাপে কোন পুরস্কার পেলেন কোন তারকা

২০