মেট্রো নিউজ অনলাইন ডেস্ক
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:০৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন দুয়ার, কাটেনি পুরোনো শঙ্কা

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে নতুন করে কর্মসংস্থানের আশা দেখছেন বিদেশগামী কর্মীরা। তবে অতীতে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে বহু কর্মী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এবার স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

‘মালয়েশিয়া আবার লোক নিয়োগ করবে।’ – একটি বাক্যই যথেষ্ট। খবরটা ছড়িয়ে পড়া মাত্রই হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে যায়। কত টাকা লাগবে? কার মাধ্যমে এগোনো যায়? ভিসা কবে পাওয়া যাবে? আমার পরিচিত কেউ আছে কি?

‘মালয়েশিয়া আবার লোক নিয়োগ করবে।’ – একটি বাক্যই যথেষ্ট। খবরটা ছড়িয়ে পড়া মাত্রই হিসাব-নিকাশ শুরু হয়ে যায়। কত টাকা লাগবে? কার মাধ্যমে এগোনো যায়? ভিসা কবে পাওয়া যাবে? আমার পরিচিত কেউ আছে কি?

একজন তরুণ হয়তো সঙ্গে সঙ্গেই টাকা জোগাড় করার কথা ভাবতে শুরু করে। কেউ ঋণ নেবে। কেউ জমি বিক্রি করার কথা ভাববে। অন্যরা একজন ‘বিশ্বস্ত’ দালাল খুঁজবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবার খুলে যেতে পারে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় সুযোগ। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে অভিবাসন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি যে, অভিবাসনের সুযোগের খবর যত দ্রুত ছড়ায়, সঠিক তথ্য তত দ্রুত ছড়ায় না। আর তথ্যের এই অভাবই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ তখন সত্য ও কল্পকাহিনীর লড়াই শুরু হয়। আসুন, এমনই কিছু সত্য ও কল্পকাহিনী নিয়ে আলোচনা করা যাক।

ভ্রান্ত ধারণা: মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খুলেছে। ২ লাখ শ্রমিককে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে।

সত্য: পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

সম্প্রতি একজন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন যে, ছয় মাসের মধ্যে ২ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিককে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। তবে, মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে যে, আগামী ছয় মাসে মালয়েশিয়ায় প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সরকারের করা দাবিটি কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়।

মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র দাতুক সেরি ফাহমি ফাদজিল বলেছেন, “বাংলাদেশের একজন প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।” মালয়েশিয়া-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউ স্ট্রেইটস টাইমস এই তথ্যটি জানিয়েছে। কতজন শ্রমিক যাবে, কোন খাতে এবং কী প্রক্রিয়ায় যাবে, সে বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট বা দালালদের কথাকে সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ভ্রান্ত ধারণা: দালালই তথ্যের সেরা উৎস।

সত্য: প্রথমে সরকারি তথ্য বা বিজ্ঞপ্তি যাচাই করুন।

একজন সম্ভাব্য অভিবাসী হয়তো জানেন না কোন এজেন্সিটি বৈধ। সরকারি ব্যয় কত তা জানে না। চাকরির চুক্তি কীভাবে যাচাই করতে হয় তা জানে না।

কিন্তু গ্রাম থেকে একজন পরিচিত এসে বলে, ‘ভাই, আমি আপনাকে মালয়েশিয়ার ভিসা পাইয়ে দিতে পারি। পাঁচ লাখ টাকা লাগবে।’ তখন সেই ব্যক্তি শুধু একজন দালালই থাকে না, সে তথ্যের প্রধান উৎস হয়ে ওঠে। নিরাপদ অভিবাসনের জন্য এটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

তথ্যের জন্য আমাদের অনিবন্ধিত দালাল ও মধ্যস্থতাকারীদের উপর নির্ভরতা কমাতে হবে। প্রথমে সরকারি তথ্য যাচাই করুন। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, বিএমইটি এবং বোসেল থেকে তথ্য যাচাই করুন। প্রয়োজনে প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার ১৬১৩৫-এ যোগাযোগ করুন।

প্রচলিত ধারণা: ভিসা মানেই চাকরি নিশ্চিত।

বাস্তবতা: ভিসা পেলেই চাকরি নিশ্চিত নয়।

কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। পদের নাম কী? বেতন কত? কাজের সময় কত ঘণ্টা? ওভারটাইম আছে কি? থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কে করবে?

এই বিষয়গুলো না জেনে শুধু ‘ভিসা মঞ্জুর হয়েছে’ শুনেই টাকা দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

২০২৩ সালে প্রকাশিত ব্র্যাকের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়া ৫৪ শতাংশ কর্মী চুক্তিতে উল্লিখিত কাজ পাননি। মাত্র ৪ শতাংশ কর্মী তিন দিনের প্রাক-প্রস্থান প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এবং ৭১ শতাংশের প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। এই পরিসংখ্যানটি পুরনো হলেও এখনও প্রাসঙ্গিক। চুক্তিটি পড়ুন, বুঝুন এবং তারপরে স্বাক্ষর করুন।

প্রচলিত ধারণা: বিদেশে গেলে টাকা আয় হবে।

বাস্তবতা: নির্দিষ্ট দক্ষতা এবং ভাষা জানা গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে যাওয়ার আগে আপনাকে একটি কাজ শিখতে হবে। আপনাকে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট অর্জন করতে হবে। আপনাকে ভাষা জানতে হবে। আপনাকে আপনার অধিকার বুঝতে হবে। অর্থাৎ, আপনাকে এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।

এই সময়ে, তথ্য বাজারে সরকার এবং এনজিওগুলোর দায়িত্ব বাড়ছে। সময় যত যাচ্ছে, ভুল তথ্যের ঝুঁকিও তত বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজবের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়াই হলো মূল চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে একটি সমন্বিত সরকারি-বেসরকারি কর্মপরিকল্পনা অপরিহার্য। গুজব ছড়ানোর আগেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সম্পর্কে তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কোন খাতে কর্মী নিয়োগ করা হবে? কতজন নিয়োগ করা হবে? খরচ কত হবে? কারা নিয়োগ দেবে? কীভাবে আবেদন করতে হবে?

সকল তথ্য সহজ বাংলায় প্রদান করতে হবে। শুধু ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি দিলেই চলবে না। তথ্য গ্রামের বাজার, চায়ের দোকান, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, মোবাইল ফোন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।

নিরাপদ অভিবাসনের মৌলিক আচরণগুলো অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে –
শুনে বিশ্বাস করবেন না।

যাচাই ছাড়া টাকা দেবেন না।

রসিদ ছাড়া কোনো লেনদেন করবেন না।

চুক্তিপত্র না পড়ে স্বাক্ষর করবেন না।

সরকারি তথ্য ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না।

সমুদ্রপথে বিদেশে যাবেন না।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। কর্মসংস্থান বাড়বে। রেমিটেন্স বাড়বে। বহু পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ ২৯ অক্টোবর

আটক ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার না দেখালে ‘গুম’ হিসেবে গণ্য হবে: চিফ প্রসিকিউটর

একরামুল হত্যা: ট্রাইব্যুনালে হাজির ৩ সেনা কর্মকর্তা

সংঘাত নয়, সমঝোতায় দেশ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন দুয়ার, কাটেনি পুরোনো শঙ্কা

বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি তারেক রহমান

পঁচা শামুকে পা কাটবে, টেরও পাবেন না: জামায়াত আমির

জাতিসংঘের নতুন বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশের কী পরিবর্তন হচ্ছে?

২৫৫ ভোট পেয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠক

১০

নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে চালু হলো পিংক বাস: উদ্বোধন সড়কমন্ত্রীর

১১

উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকারের ওপর আস্থা রাখুন: প্রধানমন্ত্রী

১২

অজিদের ডেরায় টাইগারদের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়

১৩

শিক্ষকতা থেকে বঙ্গভবন—মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ পথচলা

১৪

মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করে মনোনয়নপত্র জমা বিএনপির

১৫

এসএসসি-সমমানের ফল প্রকাশ, পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ

১৬

রাষ্ট্রপতি পদে ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করেছে বিএনপি

১৭

একদিকে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলবেন আবার বন্ধুত্ব চাইবেন, দুটো বিপরীতমুখী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৮

ঢাকার চারপাশের নৌপথ সচল করার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

১৯

“আগস্টেই যোগদানের দাবিতে শাহবাগে প্রাথমিকের সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকদের অবস্থান”

২০